ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক দৃষ্টি

মার্কিন মিত্ররা ইরান যুদ্ধে না জড়িয়েও কি বিপদমুক্ত ?



মার্কিন মিত্ররা ইরান যুদ্ধে না জড়িয়েও কি বিপদমুক্ত ?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত আজ আর শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়—এটি বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে মার্কিন মিত্র দেশগুলো। একদিকে ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা, অন্যদিকে নিজ দেশের জনগণের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান—এই দ্বিমুখী চাপ তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে করেছে অনিশ্চিত ও টালমাটাল। এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক তৎপরতা, জ্বালানি সংকট এবং নেতৃত্বের পরিবর্তিত অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন মার্কিন মিত্রদের জন্য এক চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার বিরোধিতা করা বিশ্বনেতারা এখন এক কঠিন দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়েছেন। একদিকে যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র ক্ষোভ, অন্যদিকে নিজ দেশের ভোটারদের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে মিত্রদেশগুলোর সরকার এখন টালমাটাল।

এই পরিস্থিতি ওয়াশিংটন ও তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে সম্পর্কের চিরাচরিত ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। যেসব নেতা একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করতে তোষামোদের পথ বেছে নিতেন, তারা এখন প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা করছেন এবং তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। এই দূরত্বের কারণ শুধু আদর্শিক বিরাগ নয়, বরং যুদ্ধ-সম্পর্কিত প্রচণ্ড চাপ যা তাদের জনগণের জীবিকা এবং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

এমনকি যেসব নেতা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন, তারাও এখন তার অবজ্ঞার শিকার হয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সম্প্রতি পোপকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে

‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে ট্রাম্পের বন্ধুত্ব এই যুদ্ধের কারণেই ভেঙে পড়েছে। স্টারমার স্পষ্ট জানিয়েছেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপের কারণে ব্রিটিশ নাগরিকদের জ্বালানি বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি অত্যন্ত বিরক্ত। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন, জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি এই যুদ্ধে ব্রিটেন কোনোভাবেই যোগ দেবে না।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ এর সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, ইরান সংঘাত এখন আর কেবল দূরের কোনো পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সংকট নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর জন্য অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ানো এখন অনেক নেতার জন্যই রাজনৈতিক ‘দায়’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, জর্জিয়া মেলোনি ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে ট্রাম্পের সবচেয়ে কাছের আদর্শিক মিত্র হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে চাপে আছেন। যুদ্ধের ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তার জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছে। তদুপরি, ক্যাথলিক প্রধান দেশ হিসেবে পোপের ওপর ট্রাম্পের আক্রমণ মেলোনিকে বাধ্য করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন খাদের কিনারায়। ট্রাম্পও মেলোনিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে তার ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন।

একই অবস্থা হাঙ্গেরিতেও দেখা গেছে। দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা ভিক্টর অরবান, যাকে ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মনে করা হতো, তিনি গত সপ্তাহের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অরবানের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালালেও ভোটাররা তাদের প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই ফলাফল ইউরোপের অন্যান্য জনতুষ্টিবাদী নেতাদের ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে পাকিস্তান। দেশটি জানিয়েছে, প্রায় সাত সপ্তাহের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচকদের মধ্যে দ্বিতীয় দফা বৈঠক আয়োজনের লক্ষ্যে তারা চেষ্টা চালিয়েছে। গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে আর কয়েক দিন বাকি রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত আলোচনার কোনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য এখনো কোনো তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি বলে জানানো হয়েছে। তবে আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে ইসলামাবাদ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কে আসবেন, প্রতিনিধিদলের আকার কেমন হবে, কে থাকবেন আর কে চলে যাবেন এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোই ঠিক করবে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো আলোচনাগুলো গোপন রাখা। আলোচনার তথ্য আমাদের কাছে যে পক্ষগুলো দিয়েছে, আমরা তা সংরক্ষণ করছি।

 গত ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার বৈঠক সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘না কোনো অগ্রগতি হয়েছে, না কোনো ভাঙন ঘটেছে। পারমাণবিক ইস্যু আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

 পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব বর্তমানে অঞ্চলজুড়ে সক্রিয় কূটনৈতিক সফর করছে। এটিকে ‘ইসলামাবাদ প্রক্রিয়া’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার আলোচনাকে এককালীন নয়, বরং চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বৃহস্পতিবার দোহায় পৌঁছেছেন। চার দিনের সফরের অংশ হিসেবে তিনি এর আগে জেদ্দা সফর করেন এবং এরপর তুরস্কের আন্তালিয়ায় যাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির বুধবার একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে তেহরানে পৌঁছান। প্রতিনিধিদলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও ছিলেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং পাকিস্তানের সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। একই দিনে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও তার সঙ্গে বৈঠক করেন।

ইসলামাবাদে এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পাকিস্তানেই হবে। আমরা পাকিস্তানেই আলোচনা করব, অন্য কোথাও নয়। কারণ আমরা পাকিস্তানের ওপর আস্থা রাখি।

 গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এখনো তা বহাল আছে। তবে পরিস্থিতি ক্রমেই চাপে পড়ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষ থেকেই সতর্ক আশাবাদী বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইসলামাবাদে আবারও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।

 "ইরান সংঘাতের এই দাবানল থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে 'ইসলামাবাদ প্রক্রিয়া' কি শেষ পর্যন্ত সফল হবে? নাকি মিত্রদের সাথে বাড়তে থাকা এই দূরত্ব ওয়াশিংটনকে আরও একাকী ও একঘেয়ে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে?

সময় বলে দেবে, ২২ এপ্রিলের পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির সাদা পায়রা উড়বে, নাকি আবারও গর্জে উঠবে যুদ্ধের দামামা। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই সংকট বিশ্বনেতাদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তোষামোদের রাজনীতি এখন আর জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে নয়।

 

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক দৃষ্টি

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬


মার্কিন মিত্ররা ইরান যুদ্ধে না জড়িয়েও কি বিপদমুক্ত ?

প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত আজ আর শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়—এটি বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে মার্কিন মিত্র দেশগুলো। একদিকে ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা, অন্যদিকে নিজ দেশের জনগণের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান—এই দ্বিমুখী চাপ তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে করেছে অনিশ্চিত ও টালমাটাল। এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক তৎপরতা, জ্বালানি সংকট এবং নেতৃত্বের পরিবর্তিত অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন মার্কিন মিত্রদের জন্য এক চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার বিরোধিতা করা বিশ্বনেতারা এখন এক কঠিন দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়েছেন। একদিকে যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র ক্ষোভ, অন্যদিকে নিজ দেশের ভোটারদের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে মিত্রদেশগুলোর সরকার এখন টালমাটাল।

এই পরিস্থিতি ওয়াশিংটন ও তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে সম্পর্কের চিরাচরিত ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। যেসব নেতা একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করতে তোষামোদের পথ বেছে নিতেন, তারা এখন প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা করছেন এবং তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। এই দূরত্বের কারণ শুধু আদর্শিক বিরাগ নয়, বরং যুদ্ধ-সম্পর্কিত প্রচণ্ড চাপ যা তাদের জনগণের জীবিকা এবং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

এমনকি যেসব নেতা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন, তারাও এখন তার অবজ্ঞার শিকার হয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সম্প্রতি পোপকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে

‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে ট্রাম্পের বন্ধুত্ব এই যুদ্ধের কারণেই ভেঙে পড়েছে। স্টারমার স্পষ্ট জানিয়েছেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপের কারণে ব্রিটিশ নাগরিকদের জ্বালানি বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি অত্যন্ত বিরক্ত। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন, জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি এই যুদ্ধে ব্রিটেন কোনোভাবেই যোগ দেবে না।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ এর সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, ইরান সংঘাত এখন আর কেবল দূরের কোনো পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সংকট নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর জন্য অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ানো এখন অনেক নেতার জন্যই রাজনৈতিক ‘দায়’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, জর্জিয়া মেলোনি ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে ট্রাম্পের সবচেয়ে কাছের আদর্শিক মিত্র হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে চাপে আছেন। যুদ্ধের ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তার জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছে। তদুপরি, ক্যাথলিক প্রধান দেশ হিসেবে পোপের ওপর ট্রাম্পের আক্রমণ মেলোনিকে বাধ্য করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন খাদের কিনারায়। ট্রাম্পও মেলোনিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে তার ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন।

একই অবস্থা হাঙ্গেরিতেও দেখা গেছে। দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা ভিক্টর অরবান, যাকে ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মনে করা হতো, তিনি গত সপ্তাহের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অরবানের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালালেও ভোটাররা তাদের প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই ফলাফল ইউরোপের অন্যান্য জনতুষ্টিবাদী নেতাদের ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে পাকিস্তান। দেশটি জানিয়েছে, প্রায় সাত সপ্তাহের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচকদের মধ্যে দ্বিতীয় দফা বৈঠক আয়োজনের লক্ষ্যে তারা চেষ্টা চালিয়েছে। গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে আর কয়েক দিন বাকি রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত আলোচনার কোনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য এখনো কোনো তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি বলে জানানো হয়েছে। তবে আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে ইসলামাবাদ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কে আসবেন, প্রতিনিধিদলের আকার কেমন হবে, কে থাকবেন আর কে চলে যাবেন এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোই ঠিক করবে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো আলোচনাগুলো গোপন রাখা। আলোচনার তথ্য আমাদের কাছে যে পক্ষগুলো দিয়েছে, আমরা তা সংরক্ষণ করছি।

 গত ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার বৈঠক সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘না কোনো অগ্রগতি হয়েছে, না কোনো ভাঙন ঘটেছে। পারমাণবিক ইস্যু আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

 পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব বর্তমানে অঞ্চলজুড়ে সক্রিয় কূটনৈতিক সফর করছে। এটিকে ‘ইসলামাবাদ প্রক্রিয়া’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার আলোচনাকে এককালীন নয়, বরং চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বৃহস্পতিবার দোহায় পৌঁছেছেন। চার দিনের সফরের অংশ হিসেবে তিনি এর আগে জেদ্দা সফর করেন এবং এরপর তুরস্কের আন্তালিয়ায় যাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির বুধবার একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে তেহরানে পৌঁছান। প্রতিনিধিদলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও ছিলেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং পাকিস্তানের সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। একই দিনে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও তার সঙ্গে বৈঠক করেন।

ইসলামাবাদে এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পাকিস্তানেই হবে। আমরা পাকিস্তানেই আলোচনা করব, অন্য কোথাও নয়। কারণ আমরা পাকিস্তানের ওপর আস্থা রাখি।

 গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এখনো তা বহাল আছে। তবে পরিস্থিতি ক্রমেই চাপে পড়ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষ থেকেই সতর্ক আশাবাদী বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইসলামাবাদে আবারও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।

 "ইরান সংঘাতের এই দাবানল থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে 'ইসলামাবাদ প্রক্রিয়া' কি শেষ পর্যন্ত সফল হবে? নাকি মিত্রদের সাথে বাড়তে থাকা এই দূরত্ব ওয়াশিংটনকে আরও একাকী ও একঘেয়ে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে?

সময় বলে দেবে, ২২ এপ্রিলের পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির সাদা পায়রা উড়বে, নাকি আবারও গর্জে উঠবে যুদ্ধের দামামা। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই সংকট বিশ্বনেতাদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তোষামোদের রাজনীতি এখন আর জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে নয়।

 


দৈনিক দৃষ্টি

প্রকাশক ও সম্পাদক ম‌হিউদ্দিন শিবলী ও মোহাম্মদ মহসীন
প্রধান বার্তা সম্পাদক মোকাররম মামুন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত